১৯৬২ সালের পাকিস্থান সংবিধানের বৈশিষ্টসমূহ

১৯৬২ সালের পাকিস্থান সংবিধানের বৈশিষ্টসমূহ আলোচনা করো।

ভূমিকা: ১৯৬২ সালের পাকিস্তান সংবিধান ছিল দেশটির তৎকালীন শাসনব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি। এটি জেনারেল আইয়ুব খানের শাসনামলে প্রণীত হয় এবং তার একচ্ছত্র ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। গণতন্ত্রের আওতায় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও, এটি মূলত কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়। এই সংবিধান পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করেছিল এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিভেদকে তীব্রতর করেছিল। 

১৯৬২ সালের পাকিস্তান সংবিধানের বৈশিষ্ট্যসমূহ:  

লিখিত দলিল: ১৯৬২ সালের সংবিধান ছিল একটি লিখিত দলিল, যা দেশটির শাসনব্যবস্থার সব দিক নির্ধারণ করে। এতে ২৫০টি অনুচ্ছেদ ও ৩টি সংযোজন ছিল। এটি পরিষ্কারভাবে দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালনার নির্দেশনা দেয়। পাকিস্তানের মতো একটি অগণতান্ত্রিক পরিবেশে এমন একটি বিস্তারিত দলিল প্রণয়ন শাসনব্যবস্থার একটি বড় পদক্ষেপ ছিল।  

প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা: সংবিধানে পাকিস্তানকে একটি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়, যার নাম ছিল “পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র।” রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন প্রেসিডেন্ট, যিনি মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নির্বাচিত হতেন। প্রেসিডেন্টের এই নির্বাচন পদ্ধতি তৎকালীন সময়ের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল।  

রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার: এই সংবিধান প্রেসিডেন্ট শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে। প্রেসিডেন্ট ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি মন্ত্রিসভা নিয়োগ করতেন এবং সরাসরি তাদের দায়িত্ব নির্ধারণ করতেন। পাঁচ বছরের মেয়াদে নির্বাচিত এই প্রেসিডেন্টকে পদচ্যুত করার জন্য কেবল অভিশংসন প্রয়োজন ছিল। এর ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রায় সীমাহীন হয়ে পড়ে।  

মৌলিক গণতন্ত্রের প্রবর্তন:  সংবিধানে মৌলিক গণতন্ত্র চালু করা হয়, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচিত করতেন। এই মৌলিক গণতন্ত্রীদের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট, জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচন করা হতো। এটি গণতান্ত্রিক শাসনের একটি বিকল্প পদ্ধতি হলেও প্রকৃত গণতন্ত্রের বিকাশে তা ব্যর্থ হয়।  

আরো পড়ুনঃ মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান

যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমন্বয়ে পাকিস্তানকে একটি যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করা হলেও কেন্দ্রীয় সরকার ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে দুর্বল করে কেন্দ্রীয় শাসনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়।  

গণভোটের ব্যবস্থা: সংবিধানে গণভোট ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় পরিষদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতানৈক্য হলে তা গণভোটে উপস্থাপন করা হতো। গণভোটের ফলাফল উভয় পক্ষকে মেনে চলতে বাধ্য করা হতো। এটি একটি নতুন ব্যবস্থা হলেও কার্যত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেয়।  

ইসলামি নীতি: সংবিধানের মূলনীতিতে ইসলামি নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইসলামি শিক্ষার বাধ্যতামূলকতা, কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের নিষেধাজ্ঞা এবং একটি ইসলামি আদর্শ-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিধান অন্তর্ভুক্ত ছিল।  

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সংবিধানে বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক ও স্বাধীন করার ব্যবস্থা করা হয়। বিচারকদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় এবং তাদের অপসারণের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সুপারিশ প্রয়োজন ছিল।  

উর্দু ও বাংলা ভাষার স্বীকৃতি: উর্দু ও বাংলা উভয়কে জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাষাগত বিভেদের একটি সামান্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল।  

কেন্দ্রীয় তালিকা প্রণয়ন: সংবিধানে কেন্দ্রীয় সরকারের আওতায় ৪৯টি বিষয়ে আইন প্রণয়নের তালিকা প্রণয়ন করা হয়, যা কেন্দ্রীয় তালিকা হিসেবে পরিচিত। এটি কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা আরও জোরদার করেছিল।  

আরো পড়ুনঃ মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা

আইন প্রণয়নের মৌলনীতি: সংবিধানে ১৬টি মৌলিক আইন প্রণয়নের নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এগুলো নাগরিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়, যা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক।  

নৈতিক নির্দেশিকা নীতি: ২১টি নীতি নির্ধারক মূলনীতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই নীতিগুলো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক না হলেও রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে তা অনুসরণীয় ছিল।  

ইসলামি গবেষণা ইনস্টিটিউট: সংবিধানে একটি ইসলামি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম সমাজকে ইসলামি নীতির ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা।  

ইসলামাবাদ ও ঢাকা কেন্দ্র হিসেবে:  ইসলামাবাদকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজধানী এবং ঢাকাকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।  

সংশোধন প্রক্রিয়া: সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ পদ্ধতি নির্ধারিত ছিল। জাতীয় পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন ছিল এবং প্রেসিডেন্ট এতে ভেটো দিতে পারতেন।  

উপসংহার: ১৯৬২ সালের পাকিস্তান সংবিধান গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে ব্যর্থ হয়। এটি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভাজন আরও গভীর করে। যদিও এটি কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য যুক্ত করেছিল, তবে এটি কার্যত শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

Riya Akter
Riya Akter

আমি রিয়া আক্তার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অনেকদিন যাবত কাজ করি। অবসর সময়ে মুভি দেখতে অনেক ভালো লাগে। ঘুরতে খুব বেশি পছন্দ করি। যে কাজের দ্বারা মানুষের ক্ষতি হবে এমন কাজ থেকে দূরে থাকি। সব সময় সৎ থাকার চেষ্টা করি।

Articles: 31