জন লককে আধুনিক গণতন্ত্রের জনক বলা হয় কেন?
জন লক (১৬৩২-১৭০৪) ছিলেন গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার এবং মানব স্বাধীনতার অন্যতম পথিকৃত। তাঁর চিন্তাধারা আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং পরবর্তী দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষা, রাজনীতি, এবং সমাজ সংস্কারে তাঁর অবদান আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছে ফলশ্রুতিতে তাঁকে আধুনিক গণতন্ত্রের জনক বলা হয়। নিম্নে প্রশ্নালকে আলোতে করা হলো:
আধুনিক গণতন্ত্রের জনক হিসেবে জন লকের অবদান
১. সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের প্রবর্তনঃ জন লক বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র এবং শাসকের ক্ষমতা শাসিত জনগণের সম্মতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে দেখিয়েছেন শাসকের কাজ জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনগণকে তার স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করার সুযোগ দেওয়া। তার এই সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি।
আরো পড়ুনঃ একুইনাসের মতে ‘শাশ্বত আইন’ কী?
২. প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষার তত্ত্বঃ জন লকের মতে, মানুষের জন্মগত অধিকার হলো জীবন, স্বাধীনতা, এবং সম্পত্তি। এই অধিকারগুলো রক্ষা করা রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব। এই ধারণা আধুনিক গণতন্ত্রের মানবাধিকার সুরক্ষার মূলভিত্তি গঠন করেছে।
৩. শাসকের ক্ষমতা সীমিতকরণঃ জন লক প্রথমবারের মতো শাসকের ক্ষমতা সীমিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শাসক যদি জনগণের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে জনগণ শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। এই তত্ত্ব আধুনিক দায়িত্বশীল সরকারের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
৪. সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারণাঃ জন লক আইন পরিষদকে শাসন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আইন পরিষদই জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন এবং এটি শাসকের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করবে। এই ধারণা আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
৫. গণসার্বভৌমত্বের প্রবক্তাঃ জন লক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দেন। তিনি জনগণের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ বলে মনে করতেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন প্রতিষ্ঠার ধারণা আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৬. ঐশ্বরিক রাজত্বের বিরোধিতাঃ জন লক রাজাদের ঐশ্বরিক অধিকার (Divine Right of Kings) তত্ত্বের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, রাজারা ঈশ্বরের দ্বারা শাসনের অধিকার পায়নি, বরং জনগণের সম্মতির মাধ্যমে তারা ক্ষমতা পেয়েছে। তাঁর এই তত্ত্ব স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী যুক্তি প্রদান করেছে।
৭. জনগণের ক্ষমতা দখলের অধিকারঃ জন লকের মতে, জনগণ যদি দেখে যে, শাসক তাদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তবে তারা শাসককে অপসারণ করে নিজেরাই ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে। এটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
৮. নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রের প্রবর্তনঃ জন লক স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহন করেন এবং গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জোর দাবি জানান। তিনি আইন মেনে শাসন করার পক্ষে যুক্তি দেন এবং এটিকে গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি বলে মনে করেন।
আরো পড়ুনঃ রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলার পক্ষে যুক্তি দেখাও
৯. সম্পত্তির অধিকার রক্ষাঃ জন লক বিশ্বাস করতেন, সম্পত্তির অধিকার মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এই ধারণা আধুনিক গণতন্ত্রে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১০. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাঃ জন লকের মতে, রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে যার মাধ্যমে রাষ্ট্র বসবাসরত সকল নাগরিক ধনী গরিব নির্বিশেষে একই ভাবে শাসিত হবে। তাঁর এই ধারণা আধুনিক গণতন্ত্রে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
১১. স্বাধীনতার ধারণাঃ জন লক বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তি স্বাধীনতা একটি প্রাকৃতিক অধিকার। তিনি বলেন, স্বাধীনতা মানে অন্য কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে নিজের জীবন পরিচালনা করার অধিকার। এই ধারণা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির অন্তর্ভুক্ত একটি নীতি।
১২. শিক্ষার মাধ্যমে নৈতিকতা বিকাশঃ জন লক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে নৈতিক ও সুশৃঙ্খল করার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, সুশিক্ষিত জনগণই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সফলভাবে পরিচালনা করতে পারে। তাই তিনি শিক্ষার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে প্রাধান্য দেন এবং শিশুদের নৈতিক ও শারীরিক বিকাশে শিক্ষার গুরুত্ব আরোপ করেন।
১৩. ধর্মীয় সহনশীলতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাঃ জন ধর্মীয় সহনশীলতার পক্ষে ছিলেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন যে, প্রতিটি ব্যক্তির মত প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত। এই ধারণা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
১৪. মুক্ত বাজার অর্থনীতিঃ জন লক ব্যক্তি উদ্যোগ এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে সমর্থন করতেন, যা মুক্ত বাজার অর্থনীতির ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এটি আধুনিক গণতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
১৫. নারীর অধিকার প্রসঙ্গে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিঃ জন লক পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের মর্যাদা এবং তাদের অবস্থানের উন্নতির জন্য ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারী-পুরুষ উভয়েই সমাজে সমান অধিকার পাওয়ার যোগ্য। তাঁর এই বিশ্বাস গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অন্যতম মূল ভিত্তি।
আরো পড়ুনঃ আইনের সংজ্ঞা দাও
সংক্ষেপে, জন লক ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার। তাঁর দার্শনিক চিন্তাধারা আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছে। তাঁর সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব, প্রাকৃতিক অধিকার, এবং শাসকের ক্ষমতা সীমিত করার ধারণা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলভিত্তি। এজন্যই জন লককে আধুনিক গণতন্ত্রের জনক বলা হয়।