জাতীয়তাবাদ কি আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী?

জাতীয়তাবাদ কি আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী? ব্যাখ্যা কর।

জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। জাতীয়তাবাদ নিজ জাতি, সংস্কৃতি, ও স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তা রক্ষা করতে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকতাবাদ ব্যক্তি ও জাতির ভৌগোলিক সীমানার বাইরে মানবজাতির বৃহত্তর কল্যাণ এবং বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে কাজ করে। প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে, জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী। তবে গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে এ দুটির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।

জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা ও লক্ষ্য: জাতীয়তাবাদ এমন একটি মানসিক অনুভূতি যা নিজ দেশের প্রতি প্রেম, গর্ব এবং আনুগত্য প্রকাশ করে। এটি জাতির সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং উন্নয়ন নিশ্চিতে কাজ করে। নিজস্ব জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ভৌগোলিক সীমানার প্রতি দায়িত্ববোধ জাতীয়তাবাদের মূল বৈশিষ্ট্য। 

আরো পড়ুনঃ নগরায়ন কি?

আন্তর্জাতিকতাবাদের সংজ্ঞা ও লক্ষ্য: আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো জাতি-জাতির মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার ধারণা। এটি ব্যক্তিকে তার নিজ দেশের সীমানা অতিক্রম করে সমগ্র মানবজাতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরোধ লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে, যখন জাতীয়তাবাদ উগ্র হয়ে ওঠে, তখন তা আন্তর্জাতিক ঐক্যের ধারণার বিপরীতমুখী হয়ে পড়ে। এই বিরোধের কারণগুলো বিস্তারিতভাবে নিম্নে তুলে ধরা হলো:

১। উগ্র জাতীয়তাবাদ বিশ্বশান্তির প্রতি হুমকি: উগ্র জাতীয়তাবাদ অন্য জাতির স্বার্থকে উপেক্ষা করে নিজ জাতির শক্তি বৃদ্ধির প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ প্রদর্শনে আকৃষ্ট করে। এটি সামরিক প্রতিযোগিতা  বৃদ্ধি করে এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে উগ্র জাতীয়তাবাদের কারণেই বিশ্বশান্তি ব্যাহত হয়।

২। জাতিবিদ্বেষ এবং বর্ণবাদ: উগ্র জাতীয়তাবাদের ফলে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা জাতি নিজেদের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে  অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করে। এতে জাতি বা বর্ণের মধ্যে বিদ্বেষ ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রীতির পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

৩। দুর্বলের ওপর শোষণ ও আধিপত্য: শক্তিশালী রাষ্ট্র দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিকভাবে আধিপত্য বিস্তার করে। এটি ঔপনিবেশিকতাকে উত্সাহিত করে এবং দুর্বল রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে।

৪। বিশ্ব নিরাপত্তার হুমকি: উগ্র জাতীয়তাবাদ সামরিক প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে বিশ্ব নিরাপত্তা নষ্ট করে। পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং সামরিক জোট গঠনের মতো ঘটনাগুলো এ সমস্যার অন্যতম উদাহরণ। 

৫। সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতা: উগ্র জাতীয়তাবাদ অনেক সময় সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। শক্তিশালী দেশগুলো তাদের জাতীয়তাবাদী নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে দুর্বল দেশগুলোকে শোষণ   করতে থাকে  এবং   একসময়  তাদের ভূখণ্ড দখল করে সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার সৃষ্টি করে।

৭। সন্দেহ ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি: উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের সৃষ্টি করে। এটি জাতি-জাতির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতির কারণ হয়।

৮। সংকীর্ণ ও স্বার্থপর মানসিকতা: উগ্র জাতীয়তাবাদ মানুষকে সংকীর্ণভাবে শুধু নিজের জাতির স্বার্থে কাজ করতে ওনার এত করে । যেটি বিশ্বজনীন মানবিক গুণাবলির বিকাশে বাধা দেয়।

৯।আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাব: উগ্র জাতীয়তাবাদ আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা যেমন জাতিসংঘ বা বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগকে দুর্বল করে তুলে এবং আন্তর্জাতিক ভাবে যেকোনো সমস্যা সমাধানের  প্রক্রিয়ার পথকে বাধা প্রদান করে।

জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপূরক: উগ্র জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী হলেও, জাতীয়তাবাদ সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এটি আন্তর্জাতিকতাবাদের সহায়ক হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করে উভয় ধারণার ইতিবাচক দিকগুলো একত্রে ব্যবহার করা সম্ভব।যেমন;

আরো পড়ুনঃ এলিট আবর্তন কী?

শান্তি প্রতিষ্ঠা: জাতীয়তাবাদ দেশের উন্নতি এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে। আন্তর্জাতিকতাবাদ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন জাতির মধ্যে সম্পর্ক উন্নত করে।

সর্বজনীন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি: আন্তর্জাতিকতাবাদ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে, আর জাতীয়তাবাদ বৃহত্তর বিশ্বের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা প্রদান করে।  

সম্প্রীতি ও সহযোগিতার সুযোগ: আন্তর্জাতিকতাবাদ বিভিন্ন দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে। জাতীয়তাবাদ নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করেও এর সাথে অংশ নিতে পারে।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন: উন্নত দেশগুলো জাতীয়তাবাদী চেতনায় উৎসাহিত হয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে। এটি দরিদ্র দেশগুলোর উন্নয়নের পথকে ত্বরান্বিত করে।

জাতীয় সীমানার সম্মান: আন্তর্জাতিকতাবাদ জাতীয় সীমানার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক উন্নত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা: পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, এবং দারিদ্র্যের মতো বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিকতাবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয়তাবাদও  বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে এ সকল সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

আরো পড়ুনঃ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও গুরুত্ব

উপসংহারে বলা যায়, জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ পরস্পর বিরোধী নয়, তবে উগ্র জাতীয়তাবাদ অবশ্যই আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী। প্রকৃত জাতীয়তাবাদ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এবং আন্তর্জাতিকতাবাদ বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করে। উভয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করে চললে পৃথিবী শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ হতে পারে। জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিকতাবাদ যদি  সংগতিপূর্ণভাবে পরিচালিত হয় তাহলে  তারা একত্রে মানবজাতির বৃহত্তর কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারবে। 

Sima Khatun
Sima Khatun

আমি সিমা খাতুন। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স
কমপ্লিট করেছি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আমার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য সহজভাবে শেখাতে কাজ করি। শিক্ষার্থীদের সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই আমার লক্ষ্য।

Articles: 128