যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ
ভূমিকা: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, কৃষি, এবং সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের জন্য বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগসমূহ:
১. শরণার্থী পুনর্বাসন ও ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ: মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল এবং দেশে প্রায় ৪৩ লাখ বাড়ি ধ্বংস হয়েছিল।
- শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা হয়।
- ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
- রেড ক্রস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার সহায়তায় ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়।
২. সংবিধান প্রণয়ন: স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি অস্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা হয়।
- ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান কার্যকর করা হয়।
- সংবিধানে চারটি মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা—অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
৩. শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ: স্বাধীনতার পর অধিকাংশ অবাঙালি মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল।
- পাকিস্তানি মালিকানাধীন পাট, বস্ত্র, ব্যাংক, এবং বীমা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়।
- এসব প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে পরিচালনার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়।
- ব্যাংক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করে ১২টি ব্যাংককে একীভূত করে ৬টি ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়।
৪. কৃষি খাতে উন্নয়ন: বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। যুদ্ধের সময় কৃষি উৎপাদন মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়।
- কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে সার, বীজ এবং কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণ করা হয়।
- ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করা হয়।
- কৃষি উৎপাদন বাড়াতে ন্যায্যমূল্যে ধান, পাট, এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়।
৫. শিক্ষাখাতে সংস্কার: যুদ্ধের সময় বহু স্কুল-কলেজ ধ্বংস হয়ে যায়। শিক্ষার হার কমে যায়।
আরো পড়ুনঃ মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদান
- ১৯৭২ সালে ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়।
- প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং বিনামূল্যে করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
- একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়।
৬. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের সড়ক ও রেলপথ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- ৯৭টি সড়ক সেতু এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত রেলপথ পুনর্নির্মাণ করা হয়।
- বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
৭. অর্থনৈতিক পুনর্গঠন: বাংলাদেশের অর্থনীতি যুদ্ধের সময় প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
- প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-১৯৭৮) প্রণয়ন করা হয়।
- দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
৮. পররাষ্ট্রনীতি: নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি এবং সহযোগিতা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
- শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে ভিত্তি করে একটি জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হয়।
- ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
- মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা হয়।
৯. বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন: যুদ্ধের সময় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- ধ্বংসপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।
- গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন প্রকল্প শুরু করা হয়।
১০. নারী পুনর্বাসন ও উন্নয়ন: যুদ্ধের সময় নারীরা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হন।
- ১৯৭২ সালে মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়।
- সরকারি চাকরিতে নারীদের জন্য কোটা চালু করা হয়।
১১. শ্রমিক কল্যাণ:
- শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির জন্য একটি নতুন বেতন স্কেল প্রণয়ন করা হয়।
- শিল্পে শ্রমিকদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা হয়।
১২. ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা: বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠন।
আরো পড়ুনঃ ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের পটভূমি এবং ফলাফল
- ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
১৩. ১৯৭৩ সালের নির্বাচন: স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য ১৯৭৩ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৪. আইন প্রণয়ন:
- পরিত্যক্ত সম্পত্তি অধিগ্রহণ আইন প্রণয়ন করা হয়।
- যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য দালাল আইন কার্যকর করা হয়।
১৫. সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা: বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন জনসভায় বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
উপসংহার: বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তা ছিল সময়োপযোগী এবং কার্যকর। তার উদ্যোগেই ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি জাতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় এবং একটি আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপন করে। তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের প্রচেষ্টা আজও অনুপ্রেরণা জোগায়।