কল্যান রাষ্ট্রের বৈশিষ্টসমূহ লিখো।

কল্যান রাষ্ট্রের বৈশিষ্টসমূহ লিখো। তুমি কি মনে করো যে বাংলাদেশ একটি কল্যান রাষ্ট্র। উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দাও। ★★★

ভূমিকাঃ কল্যাণ রাষ্ট্র সর্বজনীন কল্যাণ সাধনের জন্য বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করে থাকে।   এটি নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক  কল্যাণ সাধনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশ এবং রাষ্ট্রের জনসাধারণ কে জনসম্পদে রূপান্তর করার মত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। 

কল্যাণ রাষ্ট্রের বৈশিষ্টসমূহ

কল্যাণ রাষ্ট্র এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে সরকার তার নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

১. সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: কল্যাণ রাষ্ট্র ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।

২. মৌলিক চাহিদা পূরণ: নাগরিকদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

৩. সামাজিক সুরক্ষা প্রদান: অসুস্থ, বয়স্ক, এবং বেকার নাগরিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা।

৪. সমতার নিশ্চয়তা: সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা।

৫. নারী ও শিশু কল্যাণ: নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, এবং শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা।

৬. অর্থনৈতিক উন্নয়ন: কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, এবং দরিদ্রদের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ।

৭. মানবাধিকার সুরক্ষা: বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, এবং আইনের সমান অধিকার নিশ্চিত করা।

৮. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদান।

৯. রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ: অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা।

১০. দারিদ্র্য বিমোচন: দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করার জন্য প্রকল্প গ্রহণ।

বাংলাদেশ কি কল্যাণ রাষ্ট্র?

বাংলাদেশ নিজেকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। তবে এটি পুরোপুরি কল্যাণ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য পূরণ করতে পারেনি। নিচে বাংলাদেশের কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পক্ষে যুক্তি এবং সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করা হলো:

বাংলাদেশ কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পক্ষে যুক্তি

১. সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম: সরকার বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, এবং শিক্ষাবৃত্তির মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই কর্মসূচিগুলো দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সুরক্ষা জাল তৈরি করে।

২. দারিদ্র্য বিমোচন: বিভিন্ন কর্মসূচি যেমন “একটি বাড়ি একটি খামার,” “পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক,” এবং “বঙ্গবন্ধু গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প” দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। দারিদ্র্যের হার হ্রাস করে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

৩. শিক্ষা খাতে অগ্রগতি: প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ বৃত্তি ও সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে, যা নারী শিক্ষার হার বাড়িয়েছে।

৪. স্বাস্থ্যসেবা: কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পগুলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করছে। মাতৃমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর হার কমেছে।

৫. নারীর ক্ষমতায়ন: নারীদের কর্মসংস্থানে বিশেষ উদ্যোগ, গ্রামীণ অর্থনীতিতে মাইক্রোফাইন্যান্সের ব্যবহার, এবং মহিলা উদ্যোক্তা উন্নয়ন নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করেছে।

৬. পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি, যা কল্যাণ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত।

বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা

১. দারিদ্র্য এবং বৈষম্য: দারিদ্র্য এখনো দেশের একটি বড় সমস্যা। শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য স্পষ্ট। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয় বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে।

২. সামাজিক সুরক্ষার অপ্রতুলতা: সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচিগুলোর কভারেজ এখনো যথেষ্ট নয়। অনেক প্রান্তিক মানুষ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

৩. স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা: স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার মান উন্নত হলেও এখনো অনেক উন্নতির প্রয়োজন। গ্রামীণ অঞ্চলে উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার অভাব রয়েছে।

৪. নারী ও শিশু অধিকার: নারীর প্রতি সহিংসতা এবং শিশুশ্রম এখনো সমাজের বড় সমস্যা।

৫. দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা: সরকারি কর্মসূচির বাস্তবায়নে দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।

উপসংহারঃ বাংলাদেশ একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হওয়ার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম কল্যাণ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যগুলো পূরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা দূর করতে হলে সুশাসন, দুর্নীতির অবসান, এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারলে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্ষম হবে।

Sima Khatun
Sima Khatun

আমি সিমা খাতুন। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স
কমপ্লিট করেছি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আমার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য সহজভাবে শেখাতে কাজ করি। শিক্ষার্থীদের সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই আমার লক্ষ্য।

Articles: 128