মাদকাসক্তি কি? বাংলাদেশে মাদকাসক্তির কারণ ও প্রতিকার বর্ণনা করো।
মাদকাসক্তি হলো এমন এক ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্ভরশীলতা, যেখানে ব্যক্তি মাদকদ্রব্যের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ অনুভব করে এবং এটি ছাড়া অস্বস্তি বোধ করে। বর্তমান বাংলাদেশে মাদকাসক্তি একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। এটি কেবল ব্যক্তি নয় বরং পুরো সমাজের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। মাদকের প্রভাব থেকে যুবসমাজ ও সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে মাদকাসক্তির কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
মাদকাসক্তি হলো এক ধরনের মানসিক এবং শারীরিক নির্ভরশীলতা যা মাদকদ্রব্যের অতিরিক্ত বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ফলে সৃষ্টি হয়। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মাদক গ্রহণের অভ্যাস ব্যক্তি নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
মাদকাসক্তিঃ মাদকাসক্তি হলো এমন একটি অবস্থান যেখানে ব্যক্তি বারবার মাদকদ্রব্য ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। এটি শারীরিক ও মানসিক দুই দিকেই নির্ভরতা সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, মাদকাসক্তি এমন একটি অবস্থার নাম যা মাদক বা ঔষধের প্রতি প্রবল আকর্ষণ সৃষ্টি করে এবং এটি ছাড়া ব্যক্তি অস্বস্তি অনুভব করে। মাদকাসক্তি ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক, শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে মাদকাসক্তির কারণঃ মাদকাসক্তি আমাদের সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি। একজন মানুষ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন কারণে মাদকাসক্ত হতে পারে,। নিম্নে মাদকাসক্তির মূল কারণগুলোকে বিশ্লেষণ করা হল;
১। কৌতূহলঃ নতুন কিছু চেষ্টা করার প্রবণতা অনেককেই মাদকাসক্তির পথে নিয়ে যায়। বিশেষত মাদক সম্পর্কে তরুণদের কৌতূহল তাদের মাদকাসক্তির দিকে ঠেলে দেয়।
২। বন্ধুবান্ধব ও পরিবেশের প্রভাবঃ নেশাগ্রস্ত বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং মাদকদ্রব্য সহজলভ্য পরিবেশে বসবাস করার অনেকেই মাদকাসক্তির সাথে জড়িয়ে পড়ে।
৩। পরিবারে অশান্তি ও অবহেলাঃ পরিবারের মধ্যে অশান্তি, মা-বাবার অবহেলা এবং সঠিক পরামর্শের অভাব সন্তানদের মানসিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে তারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।
৪। হতাশা ও ব্যর্থতাঃ প্রেমে ব্যর্থতা, পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল, চাকরি না পাওয়া বা অন্যান্য হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে সাময়িক পরিত্রান পেতে অনেকেই মাদকের প্রতি আসক্ত হয়।
৫। সহজলভ্যতাঃ বাংলাদেশে কিছু অঞ্চলে মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হওয়ায় ফলে সে সকল অঞ্চলে মাদকদ্রব্য সেবনের হার বৃদ্ধি পায়।
৬। ক্লান্তি দূর করার অজুহাতঃ কাজের চাপ বা মানসিক বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য অনেকেই মাদকের শরণাপন্ন হয়।
৭। মানসিক শক্তির অভাবঃ মানসিকভাবে দুর্বল ব্যক্তি জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে মাদকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
৮। অর্থনৈতিক বৈষম্যঃ সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে হতাশাগ্রস্ত দরিদ্র ও বেকার যুবকরা সহজে মাদকাসক্ত হয়।
৯। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অপরাধচক্রঃ মাদক ব্যবসায়ী এবং অপরাধচক্রের তৎপরতার কারণে শহরাঞ্চলে মাদকের বিস্তার দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১০। ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবঃ ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব মানুষকে মাদকাসক্তির পথে পরিচালিত করে।
১১। বেকারত্বঃ সমাজের অনেক বেকার যুবক-যুবতী কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে নিজেদের মনের কষ্ট এবং বিষন্নতা দূর করতে মাদকাসক্তির জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১২। শিক্ষার অভাবঃ সঠিক শিক্ষা এবং সচেতনতার অভাব তরুণদের মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অনবহিত থাকার ফলে তারা মাদকদ্রব্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
১৩। বাড়ির সদস্যদের প্রভাবঃ পরিবারের কোনো সদস্য মাদকাসক্ত হলে তার প্রভাব পড়ে অন্য সদস্যদের ওপর।
১৪। মাদকদ্রব্যের বৈচিত্র্য ও জনপ্রিয়তাঃ নতুন ধরনের মাদক, যেমন ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা ইত্যাদির সহজলভ্যতা তরুণদের মাদকাসক্তির দিকে আকৃষ্ট করে।
মাদকাসক্তির প্রতিকারঃ মাদকাসক্তি দূর করার জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং সরকারের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। বাংলাদেশে মাদকাসক্তি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের কিছু কার্যকর উপায় নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১। পরিবারের ভূমিকাঃ পরিবারের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং মা-বাবার সচেতনতা সন্তানের মাদকাসক্তি প্রতিরোধে সহায়কা ভূমিকা পালন করে।
২। সচেতনতা বৃদ্ধিঃ মাদকের কুফল সম্পর্কে গণমাধ্যম, স্কুল-কলেজ, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় উপদেশের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে এর প্রতিকার করা সম্ভব।
৩। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা এবং মাদকবিরোধী প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৪। পরামর্শ ও মানসিক সহায়তাঃ মানসিক চাপ সামলানোর জন্য পরামর্শদাতা বা সাইকোথেরাপিস্টের সহায়তা নেওয়া উচিত।
৫। মাদক বিরোধী আইন প্রয়োগঃ মাদকদ্রব্য উৎপাদন, পাচার ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
৬। পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনঃ মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের জন্য আধুনিক কেন্দ্র স্থাপন এবং সেবাগ্রহীতাদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ প্রদর্শন করতে।
৭। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাঃ ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার মাদকাসক্তি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।
৮। মাদকবিরোধী প্রচারাভিযানঃ গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে মাদকবিরোধী বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।
৯। তরুণদের কর্মসংস্থানঃ বেকারত্ব দূর করার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।
১০। স্কুল ও কমিউনিটি প্রোগ্রামঃ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
১১। মাদক ব্যবসায়ীদের শাস্তিঃ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১২। মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধঃ সীমান্তে কড়া নজরদারি এবং মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১৩। সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগঃ সরকারি এবং এনজিও পর্যায়ে মাদক প্রতিরোধে উদ্যোগ গ্রহণ এবং পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করা জরুরী।
পরিশেষে বলা যায়, মাদকাসক্তি সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে একটি মারাত্মক অভিশাপ। এটি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির জীবন ধ্বংস করে না, বরং পরিবার, সমাজ এবং দেশের অগ্রগতিতেও বাধা সৃষ্টি করে। মাদকাসক্তি প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইন প্রয়োগ, পুনর্বাসন ব্যবস্থা এবং নৈতিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।