মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদান

মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদান

ভূমিকা: বাঙালির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধ দুটি সমার্থক শব্দ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত প্রতিটি রাজনৈতিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন প্রায় অসম্ভব ছিল। তাঁর দূরদর্শী চিন্তাভাবনা, সাহসিকতা এবং নেতৃত্ব বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীনতার পথ সুগম করেছে। এই আলোচনায় বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

বঙ্গবন্ধুর অবদান

১. জাতীয়তাবাদের চেতনা সৃষ্টি: দেশভাগের পর বাঙালি জাতি পাকিস্তানি শাসনের শোষণের শিকার হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগ্রত করেন। তিনি বারবার জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য জাতিকে প্রস্তুত করেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মধ্যে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২. ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা: ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে বাঙালিরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন এবং ভাষার অধিকারের জন্য আন্দোলন সুসংগঠিত করেন। জেলে থেকেও তিনি ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য ছাত্রসমাজ এবং সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা অর্জন করে।

৩. ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন: ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তফ্রন্ট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। যুক্তফ্রন্টের অন্যান্য নেতাদের সাথে তিনি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান ভ্রমণ করেন। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২২৮টি আসনে জয়লাভ করে। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়।

আরো পড়ুনঃ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংজ্ঞা ও বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশ

৪. ছয় দফা দাবি: ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন, যা বাঙালির জন্য ম্যাগনাকার্টা হিসেবে পরিচিত। ছয় দফা দাবির মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। ছয় দফায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংবিধানিক স্বাধীনতার দাবি জানানো হয়। এই দাবির মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি সুস্পষ্ট রূপ পায়। তিনি ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি গ্রামে এবং শহরে প্রচার চালান।

৫. গণঅভ্যুত্থান এবং আইয়ুব খানের পতন: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছয় দফা আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙালি জাতি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। ছাত্রসমাজ ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে, যা ছয় দফার সম্প্রসারিত রূপ। এই আন্দোলন আইয়ুব খানের পতন নিশ্চিত করে এবং বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

৬. ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করে এবং ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে। এটি ছিল বাঙালির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিরঙ্কুশ জয়। বঙ্গবন্ধুর সুস্পষ্ট নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক দক্ষতা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সফলতার পেছনে প্রধান কারণ ছিল। নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে।

৭. ৭ই মার্চের ভাষণ: ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই ভাষণে তিনি জনগণকে প্রস্তুত থাকতে বলেন এবং ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা হিসেবে কাজ করে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

আরো পড়ুনঃ ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণ ও তাৎপর্য

৮. স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠ: ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। তবে, তাঁর নেতৃত্ব এবং আদর্শ মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে।

৯. মুজিবনগর সরকারের ভিত্তি প্রস্তাব: বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা এবং আদর্শের ভিত্তিতে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। এই সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর নামই ছিল বাঙালির প্রধান অনুপ্রেরণা।

১০. মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়: বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

উপসংহার: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রায় অসম্ভব ছিল। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, সাহসিকতা এবং জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাঁকে বাঙালির জাতির পিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম এবং ত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তাঁর আদর্শ এবং নেতৃত্ব আমাদের জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে এবং এটি ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Riya Akter
Riya Akter

আমি রিয়া আক্তার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অনেকদিন যাবত কাজ করি। অবসর সময়ে মুভি দেখতে অনেক ভালো লাগে। ঘুরতে খুব বেশি পছন্দ করি। যে কাজের দ্বারা মানুষের ক্ষতি হবে এমন কাজ থেকে দূরে থাকি। সব সময় সৎ থাকার চেষ্টা করি।

Articles: 31