মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা

মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা

ভূমিকা:  ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা শুরু করে। এই গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য একটি সুসংগঠিত সরকারের প্রয়োজন ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত হয় “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকার”, যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার। এই সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল নির্ধারণ করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি তুলে ধরে।

মুজিবনগর সরকারের গঠন

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর এক মাসের মধ্যেই ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমানে মুজিবনগর) আমবাগানে এই সরকার শপথ গ্রহণ করে।

  • রাষ্ট্রপতি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
  • উপরাষ্ট্রপতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন)।
  • প্রধানমন্ত্রী: তাজউদ্দীন আহমদ।
  • অর্থমন্ত্রী: এম মনসুর আলী।
  • স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান।
  • পররাষ্ট্রমন্ত্রী: খন্দকার মোশতাক আহমদ।

শপথ গ্রহণ

যদিও সরকার গঠিত হয় ১০ এপ্রিল, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ হয় ১৭ এপ্রিল। অধ্যাপক ইউসুফ আলী মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীদের শপথ বাক্য পাঠ করান। মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ও পতাকা উত্তোলন ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা

১. মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা ও আনুষ্ঠানিকতা প্রদান:  মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিকতা প্রদান করে। এটি মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বৈধতা দেয়। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে সরকার তার কার্যক্রম পরিচালনা করে।

আরো পড়ুনঃ ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের পটভূমি এবং ফলাফল

২. মুক্তিবাহিনী সংগঠন ও সমন্বয়: মুজিবনগর সরকার মুক্তিবাহিনীকে সুসংগঠিত করে। মুক্তিযোদ্ধাদের ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। এছাড়া বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠিত হয়, যারা শত্রু পক্ষকে দুর্বল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সংগঠন ও সমন্বয় মুক্তিযুদ্ধে সাফল্যের একটি প্রধান কারণ ছিল।

৩. আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়: মুজিবনগর সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন করে। তাদের প্রচেষ্টায় ভারত, ভুটান এবং সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সমর্থন জানায়। তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

৪. ভারত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক:  মুজিবনগর সরকার ভারত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে। ভারত সরকারের সাহায্যে মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী চূড়ান্ত যুদ্ধে অংশ নেয়। এই সম্পর্ক মুক্তিযুদ্ধের সফলতায় বড় ভূমিকা পালন করে।

৫. স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধান প্রণয়ন: মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা উপস্থাপন করে। এটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংবিধানের খসড়া তৈরির মাধ্যমে দেশ পরিচালনার মৌলিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়।

৬. বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ:  মুজিবনগর সরকার বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। তাদের প্রচেষ্টায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জানায়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়।

৭. মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত:  মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, গেরিলা বাহিনী গঠন এবং দেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করার মতো কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

৮. জনসমর্থন বৃদ্ধি:  মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে। বিভিন্ন প্রচারণা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে। এর ফলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে।

৯. মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধি:  মুজিবনগর সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও সাহসিকতাকে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায় এবং তারা যুদ্ধে আরও সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেয়।

১০. যুদ্ধকালীন প্রচার: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের খবর ও দেশাত্মবোধক গান প্রচার করা হয়। এটি মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি দেশের জনগণের মনোবল অটুট রাখতে সাহায্য করে। বেতার কেন্দ্র থেকে চরমপত্র এবং বিশেষ বার্তা প্রচার করা হতো, যা শত্রুদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করত।

আরো পড়ুনঃ ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণ ও তাৎপর্য

১১. যুদ্ধ পরবর্তী পরিকল্পনা: মুজিবনগর সরকার যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের জন্য পরিকল্পনা করে। এর মধ্যে দেশের পুনর্গঠন, শরণার্থীদের পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকারের এই পদক্ষেপ নতুন বাংলাদেশের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে।

১২. আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারণা: মুজিবনগর সরকার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের খবর পৌঁছানোর জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বিবিসি, রয়টার্স, এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

উপসংহার: মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনগণের নেতৃত্ব প্রদান করে এবং স্বাধীনতার বিজয়কে ত্বরান্বিত করে। এর কার্যক্রম মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকারের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Riya Akter
Riya Akter

আমি রিয়া আক্তার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অনেকদিন যাবত কাজ করি। অবসর সময়ে মুভি দেখতে অনেক ভালো লাগে। ঘুরতে খুব বেশি পছন্দ করি। যে কাজের দ্বারা মানুষের ক্ষতি হবে এমন কাজ থেকে দূরে থাকি। সব সময় সৎ থাকার চেষ্টা করি।

Articles: 31