পেশা কি? পেশার বৈশিষ্ট সমূহ

পেশা কি? পেশার বৈশিষ্ট সমূহ আলোচনা করো।

ভূমিকাঃ সমাজকর্ম একটি সাহায্যকারী পেশা। শিল্পায়ন ও শহরায়নজনিত নানাবিধ আর্থ-সামাজিক সমস্যা সমাধান কার্যকর কর্মপন্থা উদ্ভাবনের জন্য সনাতন সমাজকল্যাণ বা সমাজকর্মের পরিবর্তে আধুনিক পেশাভিত্তিক সমাজকর্মের প্রয়োজন অনুভূত হবার প্রেক্ষিতে এর বিকাশ ঘটে। কেননা পেশা ভিত্তিক হবার কারণে সমাজকর্ম মানুষের বিভিন্ন সংকটে কার্যকরভূমিকা পালনের সুযোগ লাভ করে। সমাজকর্ম পেশাগত মর্যাদা চূড়ান্তভাবে অর্জন করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে। এ সময়ে সমাজকর্মের জ্ঞান ও দক্ষতার ব্যাপক অনুশীলন হয়েছে, উদ্ভাবন হয়েছে নতুন নতুন সমস্যা সমাধানের কৌশল, সর্বোপরি সমাজকর্মীরা কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা অর্জন করার সুযোগ পেয়েছে।

পেশা কী: ‘পেশা’ শব্দটি ফরাসি শব্দ থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ ‘বৃত্তি’, (Occupation) বা কাজ (Job)। জীবিকা নির্বাহের উপায়কে বৃত্তি বলা হয়। অর্থাৎ, ‘বৃত্তি’ বলতে কায়িক শ্রম নির্ভর কাজকে বুঝায়। যেমন: দিনমজুরি, রিকশা চালনা ইত্যাদি।

অন্যদিকে পেশার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Profession’ ল্যাটিন শব্দ Professor শব্দের সমার্থক শব্দ। যার অর্থ to make a public declaration.

প্রামাণ্য সংজ্ঞাঃ  

Dictionary of social welfare প্রদত্ত সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “Profession is an occupation based upon specialized education, skills and techniques governed by general Principles of action and a special code of ethics.” (অর্থাৎ, পেশা হলো বিশেষায়িত শিক্ষা, দক্ষতা ও কৌশল ভিত্তিক এক বৃত্তি যা সাধারণ মূলনীতি এবং বিশেষ নৈতিক মানদণ্ড দ্বারা পরিচালিত)

A. E Genn তাঁর ‘Dictionary of Management’ গ্রন্থে বলেন, “Profession is a calling in which one professes to have acquired specialized knowledge which is used either in structing, guiding or advising others.” (অর্থাৎ, পেশা হচ্ছে এমন একটি সেবা যার জন্য একজন পেশাজীবিকে অন্যকে শিক্ষাদান, নির্দেশনা বা উপদেশ প্রদানের জন্য বিশেষায়তি জ্ঞান অর্জন করতে হয়।)

সামাজিক বিজ্ঞানের অভিধান-এর মতে, (1983: 162) পেশা হচ্ছে নৈপুণ্যতা ভিত্তিক বৃদ্ধিদীপ্ত কৌশল দ্বারা বেশিষ্ট্য মণ্ডিত বৃত্তি। (Occupation Characteried by skilled intellectual technique.)

W. E. Moor এর মতে, “পেশা একটি সার্বক্ষণিক কর্ম, সেবাপ্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সমকক্ষদের সাথে পৃথক পরিচিতি, বিশেষায়িত শিক্ষা, সেবামুখিতা এবং দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সংযত স্বাতন্ত্র্যবোধ।

পরিশেষে বলা যায়, যখন কোনো প্রযুক্তি ও দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিবিশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কলাকৌশলকে বিশেষ মানদণ্ড ও নীতি অনুযায়ী বাস্তবে প্রয়োগ করে জীবিকা নির্বাহ করতে সক্ষম হয় তখন। তাকে ঐ ব্যক্তির পেশা বলে। যেমন-চিকিৎসক, আইনজ্ঞ ইত্যাদি।

পেশার বৈশিষ্ট্যসমূহঃ সকল পেশারই নিজস্ব কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে। সমাজকর্ম পেশা তার ব্যতিক্রম নয়। যে সকল বৈশিষ্ট্য বা মানদণ্ডের কোনো বৃত্তি বা কাজকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় বা বৃত্তিসমূহকে পেশা হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। সে সকল বৈশিষ্ট্যসমূহকে নিচে তুলে ধরা হলো- 

সমাজবিজ্ঞানী William E. Wickened এর মতে,

১. নিজস্ব জ্ঞান ও দক্ষতা যার মাধ্যমে পেশাদার ব্যক্তি জনসেবায় নিয়োজিত হবে।

২. পেশায় প্রবেশের জন্য চারিত্রিক গুণাবলি, প্রশিক্ষণ এবং যোগ্যতা থাকতে হবে। ৩. বিশেষ নীতিমালা থাকতে হবে।

৪. রাষ্ট্র বা সহকর্মী কর্তৃক পেশাগত মর্যাদার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

৫. নিজস্ব জ্ঞান ও দক্ষতার ভিত্তিতে বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম থাকতে হবে।

৬. পেশাগত সংগঠন থাকতে হবে যার উদ্দেশ্য হবে পেশার উন্নয়ন সাধন ও সামাজিক কর্তব্য পালন, অর্থনৈতিক মনোপলি রক্ষা করা নয়।

Ernest Greenwood -এর মতে, (NASW, 17) ১. সুশৃঙ্খল জ্ঞান, ২. পেশাগত কর্তৃত্ব, ৩. সামাজিক স্বীকৃতি, ৪. নৈতিক মানদণ্ড ও ৫. পেশাগত সংগঠন।

Warner Bochm এর মতে, ১. জনকল্যাণমুখী: ২. ধারাবাহিক; সুসংহত বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান যা প্রচারযোগ্য: ৩. নির্দিষ্ট দক্ষতা ও কর্মপদ্ধতি; ৪. পেশাগত সংগঠন।

মনীষী W. A. Friellander এর মতে, (P-485-86) 

১. বিশেষ যোগ্যতা: 

২. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে কৌশল ও দক্ষতা অর্জন; 

৩. পেশাগত সংগঠন; 

৪. নৈতিক মানদণ্ড, 

৫. পেশাগত দায়িত্ব।

নিম্নে পেশাদার সমাজকর্মের বিবর্তন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

১. প্রাচীনরূপঃ প্রাচীন যুগে মানুষ ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একে অপরের সমস্যার সমাধান করত। ধর্মীয় নেতারা এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিবর্গ অসহায় ও দুস্থ মানুষের সেবা করতেন। অনাথ আশ্রম, দুস্থ নিবাস, এবং শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজকল্যাণমূলক কাজ শুরু হয়।

২. মধ্যযুগীয় ব্যক্তিবর্গের ভূমিকাঃ মধ্যযুগে ইসলামি অনুশাসন ও খ্রিস্টান ধর্মীয় শিক্ষার প্রভাবে সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম বিস্তার লাভ করে। মধ্যপ্রাচ্যে “ওয়াকফ” ব্যবস্থার মাধ্যমে জনসেবা করা হতো। ইউরোপে গির্জাভিত্তিক সমাজসেবার প্রসার ঘটে। এই সময়ে জুয়ান লুইস ভিভস এবং মার্টিন লুথারের মতো ব্যক্তিত্বরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।

৩. আধুনিক সমাজকল্যাণের সূত্রপাতঃ ১৮শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের পর সমাজে জটিল সমস্যার উদ্ভব ঘটে। দরিদ্র আইন (Poor Laws) প্রণয়নের মাধ্যমে সমাজকল্যাণের আধুনিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। ১৬০১ ও ১৮৩৪ সালের দরিদ্র আইনগুলো দরিদ্রদের জন্য কার্যকর সমাধান প্রদান করে।

৪. যুক্তরাষ্ট্রের অবদানঃ যুক্তরাষ্ট্রে পেশাদার সমাজকর্মের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দান সংগঠন সমিতি (COS) গঠন এবং সেটেলমেন্ট হাউস আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজকর্মে পেশাদারি রূপ লাভ করে। নিউইয়র্ক স্কুল প্রতিষ্ঠা পেশাগত প্রশিক্ষণের ভিত্তি স্থাপন করে।

৫. দান সংগঠন সমিতি (COS): ১৮৭৭ সালে নিউইয়র্কে দান সংগঠন সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দরিদ্রদের কার্যকর সহায়তা প্রদান এবং আর্থিক অপচয় রোধে ভূমিকা রাখে। এটি পেশাদার সমাজকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে।

৬. সেটেলমেন্ট হাউস আন্দোলনঃ সেটেলমেন্ট হাউস আন্দোলন দরিদ্রদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং পুষ্টি নিশ্চিত করতে কাজ করে। ১৮৮৪ সালে লন্ডনে Toynbee Hall এবং ১৮৮৭ সালে নিউইয়র্কে Neighborhood Guild প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সমাজকর্ম পেশার বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

৭. নিউইয়র্ক স্কুল (New York School): ১৮৯৮ সালে নিউইয়র্ক স্কুল অব ফিলানথ্রপি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি সমাজকর্ম পেশার শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে প্রশিক্ষিত কর্মীরা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

৮. পত্রিকা প্রকাশঃ Charities Review (১৮৯১) এবং The Survey (১৯১০) নামক পত্রিকাগুলো সমাজকর্মের মুখপত্র হিসেবে কাজ করে। এগুলো সমাজের আর্থ-সামাজিক সমস্যার উপর আলোকপাত করে।

৯. আন্তর্জাতিক সম্মেলনঃ ১৯২৮ সালে প্যারিসে প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজকর্ম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫৬ সালে মিউনিখে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ৪০টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন এবং আন্তর্জাতিক সমাজকর্মী ফেডারেশন (IFSW) প্রতিষ্ঠিত হয়।

১০. সমাজকর্ম পেশার সম্প্রসারণঃ যুক্তরাষ্ট্রে সমাজকর্ম পেশা হিসেবে স্বীকৃতি লাভের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর প্রসার ঘটে। বিভিন্ন দেশে পেশাদার সমাজকর্মীদের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক হয়।

১১. পেশাগত নীতিমালাঃ ১৯৫১ সালে পেশাদার সমাজকর্মীদের জন্য আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়। এই নীতিমালা ১৯৬০ সালে NASW দ্বারা স্বীকৃত হয়।

১২. সামাজিক স্বীকৃতিঃ ১৯৬১ সালে NASW বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন সমাজকর্মীদের তালিকাভুক্ত করা শুরু করে। এতে সমাজকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

১৩. পেশাগত সংগঠনঃ ১৯১৮ সালে আমেরিকান হাসপাতাল সমাজকর্মী সমিতি এবং ১৯৫৫ সালে NASW প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি সমাজকর্ম পেশার সংগঠন হিসেবে পূর্ণতা লাভ করে।

১৪. বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্ম শিক্ষাঃ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমাজকর্মের শিক্ষা চালু হওয়া সমাজকর্ম পেশার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০শ শতাব্দীর প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, এবং ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্মের ওপর কোর্স চালু হয়। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পেশাদার সমাজকর্মী তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

১৫. জাতিসংঘের ভূমিকাঃ জাতিসংঘ এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলো সমাজকর্মের আন্তর্জাতিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৮ সালে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights) প্রকাশের মাধ্যমে দারিদ্র্য, বৈষম্য, এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়ে কাজ করার জন্য একটি বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি হয়। এটি সমাজকর্মীদের জন্য দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।

১৬. প্রযুক্তির ব্যবহারঃ আধুনিক যুগে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সমাজকর্মে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, এবং ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে সমাজকর্মীরা দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তিদের জন্য দ্রুত সেবা প্রদান করতে সক্ষম হচ্ছেন। এটি পেশাদার সমাজকর্মের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল এবং কার্যকর করেছে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজকর্ম পেশার সকল বৈশিষ্ট্য ও শর্তপূরণ করে পরিপূর্ণ পেশার মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, আধুনিক সমাজকর্মের মূল বীজ ইংল্যান্ডে অংকুরিত হলেও এর পেশাগত পরিপূর্ণতা আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সর্বশেষ সমাজকর্ম পেশাকে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৪৮ সালে সমাজসেবা কার্যক্রমের পরিচালক স্যার রাফেল (Rafel) ঘোষণা করেন, “আমেরিকায় সমাজকর্ম যে পেশাগত মর্যাদা লাভ করছে তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ পোষণ করা চলেনা।

Sima Khatun
Sima Khatun

আমি সিমা খাতুন। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স
কমপ্লিট করেছি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আমার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য সহজভাবে শেখাতে কাজ করি। শিক্ষার্থীদের সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই আমার লক্ষ্য।

Articles: 128