কী কারণে প্লেটো দার্শনিক রাজার শাসন সমর্থন করেছেন?
প্লেটো তাঁর বিখ্যাত রচনা “The Republic” (রাষ্ট্র) – এ দার্শনিক রাজার শাসনকে আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। মূলত, প্লেটোর মতে জ্ঞান, ন্যায়বিচার এবং আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে একজন দার্শনিক রাজার নেতৃত্ব প্রয়োজন। তিনি এই মতামতের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ উপস্থাপন করেছেন:
জ্ঞানের আধিপত্য: প্লেটোর দর্শনে সত্য ও ন্যায় বিচারের প্রকৃত উপলব্ধি জ্ঞানীদের দ্বারাই সম্ভব। দার্শনিকরা জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে উন্নত পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম, যেখান থেকে তারা শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ নয়, বরং পরম সত্য বা Form-এর জগৎকে উপলব্ধি করতে পারেন। এ ধরনের জ্ঞান একজন শাসককে নিরপেক্ষ ও কল্যাণমুখী সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে।
আরো পড়ুনঃ এলিট আবর্তন কী?
ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা: প্লেটো মনে করতেন, সমৃদ্ধ ও ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য শাসকের ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, বরং সর্বজনীন কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দার্শনিকরা জ্ঞানের মাধ্যমে নৈতিক মূল্যবোধ ও ন্যায়পরায়ণতার দর্শনকে উপলব্ধি করতে সক্ষম। ফলে তারা আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় পক্ষপাতহীন ও নীতিনিষ্ঠ হতে পারেন।
আবেগমুক্ত সিদ্ধান্তগ্রহণ: সাধারণ শাসকেরা প্রায়ই আবেগ, লোভ, ইন্দ্রিয়সুখ, ক্ষমতালিপ্সা ইত্যাদিতে প্রভাবিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেন। বিপরীতে, দার্শনিকরা জ্ঞানের আলোকে যুক্তিপূর্ণ ও বিবেকসম্মত সিদ্ধান্ত নেন। প্লেটোর মতে, এ ধরনের যুক্তিনির্ভর ও আবেগমুক্ত সিদ্ধান্ত জাতির স্থিতিশীলতা ও শান্তি নিশ্চিত করতে সহায়ক।
আদর্শ রাষ্ট্র গঠন: প্লেটোর বক্তব্য অনুযায়ী, আদর্শ রাষ্ট্রে তিনটি শ্রেণি থাকে—দার্শনিক (শাসক), সৈন্য (রক্ষক) ও সাধারণ জনগণ (উৎপাদক)। দার্শনিকরা শাসনের দায়িত্ব পালন করে জ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা গড়ে তোলেন, যা অন্য দুটি শ্রেণির ভূমিকা সঠিকভাবে নির্ধারণে সহায়তা করে। এভাবে রাষ্ট্রে ভারসাম্য ও সুবিন্যাস সৃষ্টি হয়।
আরো পড়ুনঃ উত্তম সংবিধান বলতে কী বুঝ?
দায়িত্বশীল নেতৃত্ব: দার্শনিক রাজার নেতৃত্বে রাষ্ট্রে স্বার্থপরতা বা ক্ষমতালিপ্সার বদলে সেবামূলক ও কল্যাণধর্মী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পায়। তাঁদের ধ্যান-ধারণা, জীবনযাত্রা এবং মানসিক গঠন এমন যে তাঁরা পার্থিব মোহ ত্যাগ করে জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণে নিবেদিত হতে পারেন।
এই কারণগুলোকে সামনে রেখে প্লেটো মনে করতেন যে দার্শনিক রাজাই সত্যিকারভাবে আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং সর্বসাধারণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সক্ষম।