পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যমূলক নীতিসমূহ
ভূমিকা: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ একত্রে তাদের ন্যায্য অধিকার ভোগ করবে বলে প্রত্যাশা করেছিল। তবে বাস্তবতা ছিল এর ঠিক বিপরীত। দুই অঞ্চলের মধ্যে ভৌগোলিক, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক পার্থক্য থাকলেও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সেই পার্থক্য দূর করার চেষ্টা না করে বৈষম্যকে আরও গভীর করে তোলে। এই বৈষম্যই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মাঝে ক্ষোভ এবং প্রতিবাদের মূল কারণ।
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য:
পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি অধিক সুবিধা প্রদান করে। এই বৈষম্যের বিভিন্ন দিক নিচে আলোচনা করা হলো:
১. রাজনৈতিক বৈষম্য: পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব পাকিস্তান, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বসবাস করত, রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত ছিল।
- সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করা: পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বেশি হওয়া সত্ত্বেও তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সবসময় কম ছিল।
- গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ: ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পরও সরকার তাদের উচ্ছেদ করে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়।
- বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার: রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতাদের বারবার কারারুদ্ধ করে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়।
আরো পড়ুনঃ মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান
২. প্রশাসনিক বৈষম্য: পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামোতেও পূর্ব পাকিস্তান ছিল বৈষম্যের শিকার।
- সিভিল সার্ভিসে বাঙালিদের অনুপস্থিতি: ১৯৬২ সালে কেন্দ্রীয় প্রশাসনে উচ্চপদে বাঙালিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১১৯, যেখানে পাকিস্তানের মোট শীর্ষ প্রশাসকের সংখ্যা ছিল ৯৫৪।
- রাজধানী করাচিতে স্থাপন: ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বাঙালিদের জন্য করাচি গিয়ে প্রশাসনিক কাজে অংশগ্রহণ করা কঠিন ছিল।
৩. অর্থনৈতিক বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের মোট আয়ের সিংহভাগ যোগান দিতেও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি শোষিত হয়।
- রাজস্ব আয়ের বণ্টনে বৈষম্য: ১৯৬৫-১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব আয় ছিল ৭২৮ কোটি টাকা, কিন্তু ব্যয় ছিল ১৩৩৬ কোটি টাকা। পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে রাজস্ব আয় ছিল ১৭৮১ কোটি টাকা এবং ব্যয় ছিল ২৭৬৭ কোটি টাকা।
- বিনিয়োগে বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানে উন্নয়ন বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল সর্বমোট বিনিয়োগের ৩৬%, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানে তা ছিল ৬৪%।
- বন্যা নিয়ন্ত্রণে অবহেলা: পূর্ব পাকিস্তান বন্যাপ্রবণ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও সরকার এই সমস্যা সমাধানে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
৪. সামরিক বৈষম্য: পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতেও পূর্ব পাকিস্তানের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য।
- সামরিক কর্মকর্তার অভাব: ১৯৫৫ সালে সামরিক বাহিনীর ২২১১ কর্মকর্তার মধ্যে বাঙালি ছিলেন মাত্র ৮২ জন।
- সামরিক বাজেটের বৈষম্য: সামরিক বাজেটের ৬০% পূর্ব পাকিস্তানের অর্থ দিয়ে নির্বাহ করা হলেও প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় পুরোপুরি পশ্চিম পাকিস্তানে করা হতো।
৫. শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উদাসীন ছিল।
- অর্থ বরাদ্দের অসমতা: ১৯৫৫-১৯৬৭ সালের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ছিল ২০৮৪ মিলিয়ন রুপি, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ৭৯৭ মিলিয়ন রুপি।
- বৃত্তি প্রদানের বৈষম্য: পাকিস্তানের মোট ৩৫টি বৃত্তির মধ্যে ৩০টি বরাদ্দ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য এবং মাত্র ৫টি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য।
- উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা: পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে রাখতে চাইলে শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে।
আরো পড়ুনঃ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর পদক্ষেপসমূহ
৬. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকেও বৈষম্য ছিল প্রকট।
- রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো: পূর্ব পাকিস্তানের রাস্তা, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, টেলিফোনসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে অবহেলা করা হয়।
- সংস্কৃতির ওপর আঘাত: রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার চেষ্টা, পহেলা বৈশাখ উদযাপনে বাধা প্রদানসহ পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ চালানো হয়।
৭. কৃষিখাতে বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তান কৃষিপ্রধান অঞ্চল হলেও কৃষিখাতে উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল অপ্রতুল।
- অর্থ বরাদ্দে বৈষম্য: পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষি উন্নয়নে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করা হলেও পূর্ব পাকিস্তানের কৃষিখাত অবহেলিত ছিল।
- পাটশিল্পের ক্ষতি: বিশ্বের ৮১% পাট উৎপাদনকারী পূর্ব পাকিস্তানে সরকার কৃষির উন্নয়ন না করায় উৎপাদন ১৯৬৫ সালে মাত্র ৩৫% এ নেমে আসে।
৮. অবকাঠামোগত বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানে উন্নত সড়ক ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য ছিল।
- বিদ্যুৎ সরবরাহে বৈষম্য: ১৯৭০ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তানে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার ছিল ১৩ কিলোওয়াট ঘণ্টা, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানে তা ছিল ১৯২ কিলোওয়াট ঘণ্টা।
৯. বাণিজ্য বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তান পাটসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে প্রধান ভূমিকা রাখলেও এর রাজস্বের সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হতো।
- পাট শিল্পের শোষণ: পূর্ব পাকিস্তান বিশ্বের মোট পাট উৎপাদনের ৮১% যোগান দিলেও পাট থেকে প্রাপ্ত আয়ের বড় অংশ পশ্চিম পাকিস্তানে খরচ হতো।
- রপ্তানি বাণিজ্যে অবমূল্যায়ন: পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি পণ্যের দাম কমিয়ে দেখিয়ে আয়ের অংশ পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হতো।
১০. শিল্পায়নে বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠী উদাসীন ছিল।
- কারখানা স্থাপনে অবহেলা: পূর্ব পাকিস্তানে নতুন কারখানা স্থাপন বা পুরনো কারখানাগুলোর আধুনিকায়নে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
- শিল্প ঋণে বৈষম্য: শিল্প ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান সর্বাধিক সুবিধা পেয়েছিল, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করা হয়।
১১. যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল।
- রেল যোগাযোগে অবহেলা: পূর্ব পাকিস্তানে রেললাইন উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
- নৌপরিবহন খাতে বৈষম্য: নদী-বহুল পূর্ব পাকিস্তানে নৌপরিবহন খাতেও কোনো উন্নয়ন ঘটানো হয়নি।
১২. ব্যাংকিং খাতে বৈষম্য: পাকিস্তানের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল।
- ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাংকের সংখ্যা ছিল খুব কম এবং সেখানে দেওয়া ঋণের পরিমাণও ছিল নগণ্য।
- সঞ্চয়ের ব্যবহার: পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের সঞ্চয় পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যবহার করা হতো।
আরো পড়ুনঃ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর পদক্ষেপসমূহ
উপসংহার: উপরোক্ত বৈষম্যের কারণেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি আস্থা হারায়। এ বৈষম্য তাদের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত করে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক নীতির কারণে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের জন্ম হয়, যা বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।