রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে কী সম্পর্ক? এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।
প্রাচীনকালে রাষ্ট্র ও সরকারকে একে অপরের সমার্থক মনে করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই বলেছিলেন, “আমিই রাষ্ট্র।” কিন্তু আধুনিক কালে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক ও পার্থক্য নিচে বর্ণিত হলো:
রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক
গঠনগত পার্থক্য: চারটি উপাদান নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত—জনসমষ্টি, ভূখণ্ড, সরকার, এবং সার্বভৌমত্ব। সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার একটি উপাদান মাত্র।
জনসমষ্টি: রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল জনগণ নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয় । কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে সরকার গঠিত হয় যারা আইন প্রণয়ন, শাসন এবং বিচারকার্য পরিচালনা করেন।
স্থায়িত্ব: রাষ্ট্র একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, যা পরিবর্তিত হয় না। কিন্তু সরকার অস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে সরকার বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্র একই রয়েছে।
প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য: রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য সর্বত্র অভিন্ন হলেও সরকারের বৈশিষ্ট্য দেশভেদে ভিন্ন। যেমন—বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার।
সার্বভৌমত্ব: রাষ্ট্র সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু সরকার কেবল এই ক্ষমতা বাস্তবায়ন করে।
ধারণা: রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত ধারণা, যা দেখা যায় না। কিন্তু সরকার মূর্ত। কারণ রাষ্ট্র ব্যক্তিবিশেষ দ্বারা পরিচালিত হয়।
পারস্পরিক সম্পর্ক: রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার অপরিহার্য। উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। একটিকে ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
পরিশেষে বলতে পারি যদিও রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য আছে, তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার প্রধান ভূমিকা পালন করে।
কল্যাণ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ: কল্যাণ রাষ্ট্র মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করে। নিচে কল্যাণ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরা হলো:
সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান: কল্যাণ রাষ্ট্র দুস্থ, অসহায়, বেকার ও বয়স্কদের জন্য ভাতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা করে।
আরো পড়ুনঃ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যহীনতার ৫ টি কারণ বর্ণনা করো।
মৌলিক চাহিদা পূরণ: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে কাজ করে।
শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা: অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে জনগণের শান্তি নিশ্চিত করে।
সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়।
ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা: ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে কল্যাণ রাষ্ট্র নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করে থাকে।
শিক্ষার উন্নয়ন: শিক্ষার প্রসার ও কুসংস্কার দূরীকরণে গুরুত্ব দেয়।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি: বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে।
নারী উন্নয়ন: নারীর ক্ষমতায়ন ও তাদের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে।
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন: দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়।
ন্যায়নিষ্ঠ শাসন ব্যবস্থা: কল্যাণ রাষ্ট্র জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের চাহিদা পূরণে কাজ করে।
আরো পড়ুনঃ অপরাধ ও বিচ্যুতির মধ্যে পার্থক্য লেখ
রাষ্ট্র নাগরিকদের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুরক্ষায় নিবেদিত। এটি সুশাসন, সামাজিক সমতা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করে, যা উন্নত জীবনযাত্রার জন্য অপরিহার্য। রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক একে অপরের পরিপূরক, যেখানে সরকার রাষ্ট্রের লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।