রুশোর সাধারণ ইচ্ছা ও সকলের ইচ্ছার পার্থক্য কী?
জ্যাঁ জ্যাক রুশো (১৭১২ – ১৭৭৮) ছিলেন আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের একজন অগ্রগামী দার্শনিক। তার সাধারণ ইচ্ছা এবং সকলের ইচ্ছার ধারণা তার Social Contract গ্রন্থে বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। রুশোর মতে, হচ্ছে জনগণের সমষ্টিগত মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য সাধারণ ইচ্ছা উদ্ভূত হয়, যা ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে। অন্যদিকে, সকলের ইচ্ছা ব্যক্তিগত ইচ্ছাগুলোর যোগফল, যা সাধারণ স্বার্থকে প্রতিফলিত নাও করতে পারে।
সাধারণ ইচ্ছা ও সকলের ইচ্ছার পার্থক্য:
লক্ষ্যগত পার্থক্য: রুশোর সাধারণ ইচ্ছার লক্ষ্য হলো সমগ্র জনগণের মঙ্গল ও কল্যাণ। এটি ব্যক্তিগত বা সংকীর্ণ স্বার্থকে অগ্রাহ্য করে সমষ্টিগত স্বার্থের ভিত্তিতে কাজ করে। অন্যদিকে, সকলের ইচ্ছা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের সমষ্টি, যা সাধারণ কল্যাণের পরিবর্তে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিগত বা বিশেষ স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
আরো পড়ুনঃ মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তার বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর
বিষয়বস্তুগত পার্থক্য: সাধারণ ইচ্ছা সবসময় ন্যায় ও কল্যাণমুখী এবং সমগ্র জনগণের মঙ্গলের প্রতীক। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। বিপরীতে, সকলের ইচ্ছা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছার সমন্বয়, যা প্রায়শই বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থকে প্রতিফলিত করে এবং সর্বজনীন কল্যাণের প্রতিফলন ঘটায় না।
বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য: সাধারণ ইচ্ছার বৈশিষ্ট্য হলো এটি অবিভাজ্য, অভ্রান্ত, সর্বজনীন, ত্রুটিহীন এবং কল্যাণমুখী। এটি সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ও চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, সকলের ইচ্ছা সর্বদা অভ্রান্ত নয় এবং প্রায়শই ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বিশেষ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কাজ করে।
আদর্শগত পার্থক্য: সাধারণ ইচ্ছা ন্যায়, নৈতিকতা এবং সামাজিক কল্যাণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। এটি সমাজসেবার আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং সর্বজনীন মঙ্গল সাধনের লক্ষ্যে কাজ করে। অন্যদিকে, সকলের ইচ্ছা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এটি সাধারণ ইচ্ছার মতো উন্নত নৈতিক মানদণ্ডে অনুপ্রাণিত নয়।
প্রকৃতি: সাধারণ ইচ্ছা হচ্ছে অভ্রান্ত, ন্যায়সংগত এবং সর্বজনীন। এটি সবার জন্য কল্যাণকর। অন্যদিকে, সকলের ইচ্ছা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয় যা প্রায়শই বিরোধপূর্ণ হয়ে থাকে।
সংগঠনের ধরন: সাধারণ ইচ্ছা সার্বভৌম এবং অবিভাজ্য। এটি রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। অন্যদিকে, সকলের ইচ্ছা বিভাজ্য এবং প্রায়শই সংঘাত সৃষ্টি করে।
ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক: সাধারণ ইচ্ছা ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে এবং সমাজের মঙ্গলকে অগ্রাধিকার দেয়। সকলের ইচ্ছা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
আরো পড়ুনঃ এরিস্টটলের সরকারের শ্রেণিবিভাগ লিখ
সামাজিক প্রভাব: সাধারণ ইচ্ছা সমাজের ঐক্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। সকলের ইচ্ছা প্রায়শই সমাজে বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ: সাধারণ ইচ্ছার সিদ্ধান্ত গণমুখী এবং ন্যায়পরায়ণ। অন্যদিকে, সকলের ইচ্ছার সিদ্ধান্ত প্রায়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ বা বিশেষ স্বার্থের পক্ষপাতিত্ব করে।
সমাজচেতনা: সাধারণ ইচ্ছা একটি নৈতিক চেতনার প্রতিফলন, যা সব নাগরিকের জন্য কল্যাণ নিশ্চিত করে। সকলের ইচ্ছা নৈতিকতার অভাবজনিত এবং প্রায়শই সঙ্কীর্ণ স্বার্থে সীমাবদ্ধ।
শেষ কথা রুশোর সাধারণ ইচ্ছা সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য প্রাসঙ্গিক এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতীক। সাধারণ ইচ্ছা রাষ্ট্রের ন্যায়, সংহতি এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। অন্যদিকে, সকলের ইচ্ছা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে সীমাবদ্ধ, যা প্রায়শই সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে।