সামাজিক আইন কি? যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০ এর প্রধান প্রধান ধারা

সামাজিক আইন কি? যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০ এর প্রধান প্রধান ধারা উল্লেখ করো। [জা.বি. ২০২২]★★★

ভূমিকাঃ সামাজিক আইন হলো সেইসব আইন যা সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রণীত হয়। এই আইনগুলি ব্যক্তির অধিকার এবং কর্তব্য নির্ধারণ করে এবং সমাজের সুরক্ষা ও শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে। সামাজিক আইনের মধ্যে পারিবারিক আইন, সম্পত্তি আইন, বিবাহ ও তালাক আইন, এবং যৌতুক নিরোধ আইন অন্তর্ভুক্ত।

সামাজিক আইনের সংজ্ঞাঃ সামাজিক আইন বলতে সামাজিক জীব হিসেবে সমাজে বসবাস করতে গিয়ে মানুষকে যেসব নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়, সেগুলোকে বুঝায়। সামাজিক আইন বলতে সমাজ কর্তৃক গৃহীত সেসব সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপকে বুঝায়, যা সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে ক্ষতিকর অবস্থা থেকে ক্ষতিকর উপাদানসমূহ দূর করে সামাজিক অগ্রগতি ও লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞাঃ নিম্নে সামাজিক আইনের কিছু জনপ্রিয় সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:

অধ্যাপক হল্যান্ড এর মতে, ‘রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বলবৎকৃত এবং মানুষের বাহ্যিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণকারী সাধারণ বিধিই আইন।

ডব্লিউ. উইলসন এর মতে, “সামাজিক আইন হলো সমাজের সেসব সুপ্রতিষ্ঠিত প্রথা বা রীতি-নীতি যেগুলো সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত ও রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত বিধিতে পরিণত হয়েছে এবং যেগুলোর পেছনে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সমর্থন রয়েছে।”

স্যার হেনরী মেইন এর মতে, “কেবল সার্বভৌম শক্তির অনুশাসনই আইন নয়, দেশের প্রচলিত আচার-আচরণও আইন বলে স্বীকৃত। যদিও এগুলো কোনো সার্বভৌম শক্তির আদেশে তৈরি হয়নি।”

ভারতীয় সমাজকর্ম বিশ্বকোষ অনুযায়ী, “যথাযথ আইনসিদ্ধ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গৃহীত সামাজিক প্রথার সংশোধনকে সামাজিক আইন বলা যেতে পারে। এরূপ প্রথার কাজ হলো সাধারণত কোনো সমাজে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যার্জনের ব্যবস্থা করা।”

সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, “সামাজিক আইন বলতে সমাজজীবন হতে অবাঞ্ছিত অবস্থা দূর করে, সুষ্ঠু ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে প্রয়াস পায় সেগুলোকে বুঝায়। সমাজ সংস্কার সামাজিক আইনের মূল লক্ষ্য।” 

যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০ বাংলাদেশের একটি বিশেষ আইন, যা যৌতুক প্রদান, গ্রহণ, এবং এ সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রণীত। এর প্রধান প্রধান ধারাগুলো নিম্নরূপ:

১. সংজ্ঞা (ধারা ২): এই ধারায় “যৌতুক” শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোনো পক্ষের বিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য বা তার পূর্বে, সময়ে বা পরে, কোনো মূল্যবান জিনিস, নগদ অর্থ, বা সম্পত্তি প্রদানের দাবি বা প্রদানকে যৌতুক বলা হয়।

২. যৌতুক গ্রহণ বা প্রদানে শাস্তি (ধারা ৩): যৌতুক গ্রহণ বা প্রদানের শাস্তি হিসেবে ৫ বছরের কারাদণ্ড (কমপক্ষে ১ বছর) বা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

৩. যৌতুকের জন্য প্ররোচনা দেওয়া (ধারা ৪): যদি কেউ যৌতুক প্রদানের জন্য প্ররোচিত করে বা চাপে ফেলে, তবে তার জন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড (কমপক্ষে ১ বছর) বা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

৪. অপরাধ অ-সমঝোতাসাপেক্ষ (ধারা ৫): যৌতুক-সম্পর্কিত অপরাধসমূহ অ-সমঝোতাসাপেক্ষ এবং এটি জামিন অযোগ্য। অর্থাৎ, আদালতের অনুমতি ছাড়া মামলা প্রত্যাহার বা সমঝোতা সম্ভব নয়।

৫. বিচারকার্য (ধারা ৬): যৌতুকের মামলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারযোগ্য। ম্যাজিস্ট্রেট ১ম শ্রেণির হতে হবে।

৬. মামলার সময়সীমা (ধারা ৭): যৌতুকের অপরাধের জন্য মামলা করতে হলে বিবাহ অনুষ্ঠান বা যৌতুক প্রদান/গ্রহণের ১ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।

৭. বিদ্যমান আইন অগ্রাহ্য করা (ধারা ৮): এই আইন কার্যকর হওয়ার পর অন্য কোনো আইনের সঙ্গে বিরোধ হলে, যৌতুক নিরোধ আইনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

৮. আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য: এই আইন যৌতুক প্রথা রোধ এবং নারীর প্রতি শোষণ বন্ধ করার লক্ষ্যে প্রণীত।

৯. যৌতুকের দাবির প্রমাণ (ধারা ৯): কোনো যৌতুক গ্রহণ, প্রদান বা দাবি প্রমাণিত হলে, আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তি আরোপ করতে পারে। আদালত সংশ্লিষ্ট ঘটনার ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে।

১০. যৌতুকের প্রতিকার (ধারা ১০): যৌতুকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নারী বা তার পরিবার ক্ষতিপূরণের জন্য আদালতে আবেদন করতে পারে। আদালত অপরাধীর থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের নির্দেশ দিতে পারে।

১১. নারী ও শিশু সুরক্ষা (বিশেষ বিধান): এই আইনে নারীর অধিকার এবং শিশুদের যৌতুক-সংক্রান্ত শোষণ থেকে সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

১২. সরকারি অনুমোদন ছাড়া মামলা প্রত্যাহার নিষিদ্ধ (ধারা ১১): যৌতুকের মামলার ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন ছাড়া মামলা প্রত্যাহার করা যাবে না। এটি নিশ্চিত করে যে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কোনো সমঝোতার মাধ্যমে শাস্তি এড়াতে না পারে।

১৩. অভিযোগ দায়েরের অধিকার (ধারা ১২): ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজে বা তার পরিবার, এমনকি কোনো তৃতীয় ব্যক্তি, যৌতুক সংক্রান্ত অপরাধের বিষয়ে আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারে।

১৪. সম্পত্তি ফেরতের ব্যবস্থা (বিশেষ বিধান): যদি যৌতুক হিসেবে কোনো সম্পত্তি প্রদান করা হয় এবং তা প্রমাণিত হয়, তাহলে আদালত নির্দেশ দিতে পারে সেই সম্পত্তি প্রকৃত মালিককে ফেরত দেওয়ার।

১৫. অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা: যৌতুকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করার জন্য এই আইনে বিশেষভাবে সময়-সীমা নির্ধারণের নির্দেশনা রয়েছে, যাতে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত না হয়।

১৬. পুনর্বাসন ও সচেতনতা কার্যক্রম (অপ্রকাশিত বিধান): আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে যৌতুক প্রথা প্রতিরোধে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

১৭. বিচারের অগ্রাধিকার (বিশেষ প্রভিশন): যৌতুক সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালত এই ধরনের মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়।

১৮. প্রতিরোধ কমিটি গঠন: স্থানীয় পর্যায়ে যৌতুক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়, যারা সমাজে যৌতুক বিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করে।

১৯. প্রভাবিত নারীদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা: ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের আর্থিক, সামাজিক এবং মানসিক পুনর্বাসনের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে। 

উপসংহারঃ যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০ বাংলাদেশে নারী অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যদিও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও এটি নারীর মর্যাদা রক্ষার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে এবং যৌতুক প্রথা নির্মূল করতে আইন, সচেতনতা, এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সমন্বয় অপরিহার্য।

Sima Khatun
Sima Khatun

আমি সিমা খাতুন। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স
কমপ্লিট করেছি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আমার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য সহজভাবে শেখাতে কাজ করি। শিক্ষার্থীদের সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই আমার লক্ষ্য।

Articles: 128