সমাজ সংস্কারে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের অবদান

সমাজ সংস্কারে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের অবদান আলোচনা করো। ★★★

ভূমিকাঃ ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশাল ব্যক্তিত্ব শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। রাজনৈতিক, শিক্ষা, নিপীড়িত ও শোষিত জনগণের মুক্তিদাতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি যে অবদান রেখে গিয়েছেন তা বাংলার তথা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে তাকে অমরত্ব দান করেছে। সময় কোনো কোনো মানুষকে সৃষ্টি করে। আবার কেউ কেউ এক একটি বিশেষ সময়ের জন্য জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সাহসী সৈনিকের মতো জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে বুঝাতে পেরেছিলেন এবং তাদের প্রিয় নেতা হিসেবে স্ব-শ্রেণিতে অবস্থান করেই স্বীয় ভূমিকা এবং কর্তব্য নির্ধারণ ও পালনে সক্ষম হয়েছিলেন।

শেরে বাংলার কর্মধারাঃ সুদীর্ঘ ঘটনাবহুল জীবনে শেরে বাংল ফজলুল হক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর কর্মকালের মাধ্যমে আদর্শের যে পরিচয় ফুটে ওঠে তার মধ্যে সময়ের ধারাবাহিকতায় তাকে প্রধানত চারটি খাতে প্রবহমান দেখতে পাওয়া যায়।

  • তিনি মুসলমানদের শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে এদেশে একটি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠনের চেষ্টা চালান।
  • তিনি জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বাঙাদি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটানোর চেষ্টা করেন।
  • তিনি মহাজনী তথা জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের সপক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলেন।
  • তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী। 

রাজনীতিতে অবদানঃ নির্দিষ্ট আদর্শ ও লক্ষ্যকে সমানে রেখে ফজলুল হক রাজনৈতিক জীবন শুরু করে। মানব স্বাধীনরা ও নিয়মতান্ত্রিক শাসনের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা ছিল। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন বিদ্যমান শ্রেণিভিত্তিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ব্যতীত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সার্থক হতে পারে না। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলিম সম্প্রদায়কে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ রেখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের প্রবক্তা। 

ফজলুল হকের মতে, গণতন্ত্র হলো In a democracy the government of the people by the people must be the government of all the people by all the people, not the people,” অর্থাৎ গণতন্ত্রে, জনগণ দ্বারা গঠিত জনগণের সরকার হতে হবে সকল মানুষের দ্বারা গঠিত সরকার। জনগণের একাংশের সরকার জনগণের সরকার হয় না।” 

তাছাড়া এদেশের কৃষকদের মুক্তি ও তাদের রাজনীতি সচেতন করার জন্য ১৯২২-৩৮ সাল পর্যন্ত কৃষক প্রজা আন্দোলন সৃষ্টি ও পরিচালনা করেছিলেন। ১৯২৮ ও ২৯ সালে মুসলিম লীগ সফল করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনেকখানি। তিনি ১৯৩৪ সালে লক্ষীনিরঞ্জন সরকারকে পরাজিত করে কলিকাতার মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৫ সালে লক্ষ্ণৌতে অনলবর্ষী উর্দু ভাষায় বক্তৃতার জন্যে তাকে “শেরে বাংলা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৩৭ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪০ সালে তিনি লাহোর প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯৫৫ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে তিনি এদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। 

শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানঃ  শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় প্রতিবারই তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিজ দায়িত্বে রেখেছিলেন। ১৯০৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত “মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের” অন্যতম সংগঠক ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। ১৯১২ সালের বঙ্গীয় আইন পরিষদে উত্থাপিত “শিক্ষা পরিকল্পনা বিল” এদেশে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

১৯১২ সালে তিনি মুসলিমছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বাংলার গভর্ণরের সাহায্যের জন্য “সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান এডুকেশনাল এসোসিয়েশন” গড়ে তোলেন। কলকাতায় ‘কারমাইকেল ও ট্রেলর হোস্টেল” নির্মাণে ফজলুল হকের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি নেতৃস্থানীয় উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেন। 

১৯২৪ সালে ফজলুল হক শিক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজ এবং মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীদের আর্থিক সাহায্য দানের জন্য মুসলিম এডুকেশনাল ফান্ড” গঠন করেন। ১৯৩৭ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকার প্রাক্কালে মুসলমান মেয়েদের জন্য “লেডী ব্রাবোর্ণ কলেজ” স্থাপন করেন। তাঁর আমলেই স্কুল ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গঠনের বিল আনীত হয়। সুতরাং বলা যায়, শিক্ষাক্ষেত্রে এ কে ফজলুল হকের অবদান খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষক ও শ্রমিকদের কল্যাণে ফজলুল হকের অবদান

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, বাংলা অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন, যিনি কৃষক ও শ্রমিকদের কল্যাণে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তার সময়ে কৃষক ও শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি ও অধিকার রক্ষায় তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। নিচে তার কৃষক ও শ্রমিক কল্যাণে অবদান সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

১. কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্বঃ ফজলুল হক কৃষকদের জন্য বিভিন্ন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন এবং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করেছিলেন। তার নেতৃত্বে কৃষকদের উপর বিভিন্ন অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে।

২. কৃষকদের জন্য ভূমি সংস্কারঃ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ভূমি সংস্কারের পক্ষে ছিলেন এবং কৃষকদের জমি ও সম্পত্তির অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। তিনি ভূমির মালিকানা সুরক্ষিত করার জন্য আইন প্রণয়নের পক্ষে কাজ করেছিলেন, যাতে কৃষকরা তাদের জমির লাভ পেতে পারে এবং জমি থেকে বঞ্চিত না হয়।

৩. কৃষক দারিদ্র্য দূরীকরণঃ ফজলুল হক কৃষকদের দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি সরঞ্জাম সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার সময়ে কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাতে তারা কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারে।

৪. কৃষক শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি আইনঃ ফজলুল হক শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি আইন প্রবর্তনের জন্য কাজ করেছিলেন। তিনি শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন।

৫. কৃষক ও শ্রমিকদের জন্য সোসাইটি ও সমবায় ব্যবস্থাঃ তিনি কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সমবায় ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রচলন করানোর চেষ্টা করেন। কৃষকরা যাতে সহজে কৃষিজাত পণ্য বাজারজাত করতে পারে এবং লাভের ভাগ পায়, সেজন্য তিনি সমবায় ভিত্তিক সংগঠন গঠনে উৎসাহিত করেছিলেন।

৬. শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণঃ ফজলুল হক শ্রমিকদের জন্য কর্মঘণ্টা নির্ধারণের পক্ষে ছিলেন। তার সময়ে শ্রমিকদের দীর্ঘ সময় কাজের শর্ত পরিবর্তন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং তারা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ কাজের পরিবেশ পায়, সেজন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল।

৭. কৃষক আন্দোলনের আইনি সহায়তাঃ ফজলুল হক কৃষকদের আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি কৃষকদের বৈধ অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন তৈরি ও সংশোধন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা তাদের জমি ও সম্পত্তির অধিকারকে সুরক্ষিত করত।

৮. কৃষক শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিঃ তিনি কৃষক ও শ্রমিকদের সমাজে মর্যাদা দেওয়ার জন্য নানা পদক্ষেপ নেন। তার প্রচেষ্টার ফলে সমাজের নিচু শ্রেণির মানুষের মাঝে আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তারা নিজেদের অধিকারের প্রতি সচেতন হয়ে ওঠে।

৯. কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় আইন প্রণয়নঃ ফজলুল হক কৃষকদের স্বার্থে বিভিন্ন আইন প্রণয়নের জন্য প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। তিনি কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করেছিলেন।

১০. কৃষক শ্রমিকদের জন্য রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিঃ ফজলুল হক কৃষক ও শ্রমিকদের রাজনৈতিক সচেতনতার দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। তিনি তাদের অধিকার ও ন্যায্য দাবির প্রতি সচেতন করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানান।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কর্মময় জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এবং পদক্ষেপই মানবসেবাই উৎসর্গীকৃত ছিল। তিনি ছিলেন জনদরদী হৃদয়বান মানুষ। তাঁর রাজনীতি কখনও হিংসাত্মক বা ষড়যন্ত্রমূলক ছিল না। তিনি বাংলার দুঃস্থ মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তাই তো তাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিচারপতি রাধিকা রঞ্জন গুহ বলেন, “ফজলুল হক আমেরিকায় জন্ম নিলে হতেন ওয়াশিংটন। বিলেতে জন্ম নিলে হতেন ডিসরেলী, রাশিয়ায় জন্ম নিলে হতেন লেলিন এবং ফ্রান্সে জন্ম নিলে হতেই রুশো কিংবা নেপোলিয়ন।” এ মহান পুরুষ ১৯২৬ সালে পরলোকগমন করেন। 

Sima Khatun
Sima Khatun

আমি সিমা খাতুন। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স
কমপ্লিট করেছি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আমার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য সহজভাবে শেখাতে কাজ করি। শিক্ষার্থীদের সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই আমার লক্ষ্য।

Articles: 128