সমাজকর্মের সংজ্ঞা দাও। সমাজকর্মের লক্ষ্য ও তা পাঠের গুরুত্ব আলোচনা করো। [জা.বি. ২০১৩, ২০১৫, ২০১৯, ২০২২] ★★★
ভূমিকাঃ সমাজকর্ম হলো একটি বিশেষ ক্ষেত্র যা সমাজের বিভিন্ন সমস্যা, বিশেষ করে অসামাজিক অবস্থা এবং অসহায় মানুষদের সাহায্য করার জন্য তৈরি। সমাজকর্মের মূল উদ্দেশ্য হল সামাজিক সমস্যা ও অব্যবস্থাপনার সমাধান, মানুষের অধিকার রক্ষা, ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। এটি সমাজের সকল স্তরের মানুষের কল্যাণ সাধনে অবদান রাখে এবং একটি সামাজিক সুরক্ষার পরিবেশ তৈরি করে। সমাজকর্ম শুধু তাত্ত্বিক বিষয় নয়, এটি একটি বাস্তবিক এবং মানবিক প্রচেষ্টা যার মাধ্যমে সমাজের সমস্যা মোকাবিলা করতে পারে।
সমাজকর্মের সংজ্ঞাঃ সমাজকর্ম বা সোশ্যাল ওয়ার্ক, সামাজিক পরিবর্তন, উন্নয়ন, সংহতি, এবং মানুষের অধিকার সুরক্ষায় মনোনিবেশ করে। এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করে এবং বিশেষভাবে দুর্বল, নিপীড়িত, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সাহায্য নিয়ে আসে। সমাজকর্ম এমন একটি পেশাগত কার্যক্রম, যেখানে সমাজের সমস্যাগুলোর চিহ্নিতকরণ ও সমাধানে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, ও নৈতিকতা প্রয়োগ করা হয়। সমাজকর্মীরা সমাজের নানা দিক নিয়ে কাজ করে যেমন—গরিবি, বেকারত্ব, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, অশিক্ষা, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, এবং অন্যান্য সামাজিক সমস্যাগুলি।
বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন সময়ে সমাজকর্মের (social work) স্ব-স্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে তাঁদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংজ্ঞা প্রদান করা হলো।
হার্বাট বিষ্ণু বলেন, সমাজকর্ম হচ্ছে সেই হিসেবে ব্যবস্থা যা সমাজের পূর্ণ এবং কার্যকরী অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে যেসব সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা বর্তমানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আসতে পারে সেগুলো দূরীকরণে মানুষকে একক কিংবা দলীয়ভাবে সাহায্য করে। হার্বাট বিষ্ণু প্রদত্ত সংজ্ঞায় সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা সমাধানে জনগণের অংশগ্রহণের ব্যাপারটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এছাড়া সংজ্ঞা টিতে বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে সতর্কতা করা হয়েছে। এই সংজ্ঞাটি দুর্বল প্রকৃতির।
ডব্লিউ এ ফিডল্যান্ডের বলেন, সমাজকর্ম মানব সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও দক্ষতা সম্পন্ন পেশাদার সেবা যা কোন ব্যক্তি দল বা সমষ্টিকে ব্যক্তিগত বা সামাজিক সন্তুষ্টি লাভ এবং স্বনির্ভরতা অর্জনের সহায়তা করে থাকে। ডব্লিউ এ ফিডল্যান্ডার সংজ্ঞা পেশার বৈশিষ্ট্য টি ফুটে উঠেছে। তিনি সমাজকর্মকে সাহায্যকারী ও দক্ষতা সম্পন্ন পেশা এবং সেবার মান সন্তোষজনক বলে মনে করেছেন। তার সংজ্ঞায় সমাজকর্মী এবং সাহায্যার্থীর বিষয়টি ফুটে উঠেছে। এর সংজ্ঞাটি সমাজকর্মের সফল সংজ্ঞা।
সমাজকল্যাণ অভিধানের ভাষায়, সমাজকর্ম হলো অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কৌশলের নৈতিক ও উদ্দেশ্যমূলক প্রয়োগ যায় ব্যক্তি দল বা প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত এবং সামাজিক কার্যক্রম জোরদার করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়ে থাকে। যা সকলের কল্যাণের জন্য সহায়ক সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টিতে প্রয়োগিক অভিজ্ঞতা কে কাজে লাগায়।
রেক্স এ স্কিট মোর ও মিল্টন জি থাকার বলেন, সমাজকর্ম হচ্ছে এমন এক কলা বিজ্ঞান এবং পেশা যা ব্যক্তিগত সমাজকর্ম দল সমাজকর্ম সমষ্টির সংগঠন প্রশাসন ও গবেষণা সহ সমাজকর্ম অনুশীলনের মাধ্যমে জনগণকে এমনভাবে সহায়তা করে যাতে তারা তাদের ব্যক্তিগত দলীয় ও সমষ্টির সমস্যা সমাধান করে সন্তোষজনক ব্যক্তিগত দলীয় এবং সামাজিক সম্পর্ক লাভে সক্ষম হয়।
সমাজকর্মের লক্ষ্য
সমাজকর্মের মূল লক্ষ্য হলো সমাজে অবস্থানরত সকল শ্রেণির মানুষের জন্য সমতা, ন্যায্যতা, এবং কল্যাণ নিশ্চিত করা। এটি বিভিন্ন উপায়ে সমাজের উন্নতি সাধন করে, যার মধ্যে রয়েছে:
১. মানবাধিকার রক্ষা: সমাজকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। এটি সকল মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা, ও সমতার অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করে।
২. সামাজিক সমস্যা সমাধান: সমাজের নানা ধরনের সমস্যা যেমন দারিদ্র্য, বৈষম্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব, নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করা। সমাজকর্মীরা এসব সমস্যার সমাধান সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির মাধ্যমে করতে সাহায্য করে।
৩. সামাজিক উন্নয়ন: সমাজকর্মের লক্ষ্য হলো সমাজে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা। এটি সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ও সংস্কৃতির উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
৪. নির্যাতিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সহায়তা: সমাজকর্মের একটি অন্যতম লক্ষ্য হলো সুবিধাবঞ্চিত, অবহেলিত, ও নিপীড়িত জনগণের সাহায্য করা। এটি তাদের জীবনমান উন্নত করার জন্য কাজ করে।
৫. বিশ্বজনীন সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা: সমাজকর্ম বিশ্বজনীন সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিকে একধাপ এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। এটি সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সমান মর্যাদা ও সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে।
৬. পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি: সমাজকর্মের একটি লক্ষ্য হলো পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করা, যাতে একজন সমাজকর্মী সমাজের সমস্যা মোকাবিলা করতে সক্ষম হন। এটি প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে করা হয়।
৭. সামাজিক পরিবর্তন: সমাজকর্মের কাজ সমাজে পরিবর্তন আনা, সমাজের ন্যায্যতা ও শ্রদ্ধার পরিবেশ গঠন করা, যাতে সমস্ত জনগণ তাদের অধিকার ও মর্যাদা পায়।
সমাজকর্মের পাঠের গুরুত্ব
সমাজকর্মের পাঠ সমাজে নানা দিক নিয়ে কাজ করতে সাহায্য করে, যার মধ্যে রয়েছে সামাজিক উন্নয়ন, মানবাধিকার রক্ষা, এবং সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখা। সমাজকর্মের পাঠের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো:
১. মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ: সমাজকর্মের পাঠ মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে, যেমন সহানুভূতি, সহমর্মিতা, দয়া, সামাজিক দায়িত্ববোধ, ও নৈতিকতার চর্চা। এই মূল্যবোধ সমাজকর্মীকে সমাজের বিভিন্ন দুর্বল শ্রেণীর মানুষের পাশে দাঁড়াতে সাহায্য করে।
২. সামাজিক সমস্যার চিহ্নিতকরণ ও সমাধান: সমাজকর্মের পাঠের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সমাজকর্মীরা বিভিন্ন ধরনের সমস্যা যেমন দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, স্বাস্থ্যসেবার অভাব ইত্যাদি চিহ্নিত করতে সক্ষম হন এবং তাদের সমাধানও বের করতে পারেন।
৩. শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক গঠন: সমাজকর্মের পাঠ সমাজে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়ক। এটি সমাজের নানা শ্রেণির মধ্যে সম্পর্ক উন্নত করতে সাহায্য করে এবং সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠা করে।
৪. সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা: সমাজকর্মের পাঠ সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে। এটি সমাজে বৈষম্য দূর করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে সাহায্য করে, যেমন নারী-পুরুষ সমতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা ইত্যাদি।
৫. অসহায়দের সহায়তা প্রদান: সমাজকর্মের পাঠের মাধ্যমে সমাজকর্মীরা অসহায়, দরিদ্র, শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের সাহায্য করতে সক্ষম হন। এটি তাদের জীবনমান উন্নত করতে সহায়ক।
৬. পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন: সমাজকর্মের পাঠ পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করে। একজন সমাজকর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য নানা ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হয়, যেমন যোগাযোগের দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, ও অন্যের প্রতি সহানুভূতির দক্ষতা।
৭. সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা: সমাজকর্মের পাঠ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পথ দেখায়। এটি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য কাজ করে এবং সমাজের যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর সমাধান পেতে সাহায্য করে।
৮. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: সমাজকর্মের পাঠ সমাজের নানা সমস্যা নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করে। এটি শিক্ষার্থীদের সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে জানাতে এবং সেগুলোর সমাধান নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করে।
উপসংহারঃ সমাজকর্মের গুরুত্ব কখনোই অস্বীকার করা সম্ভব নয়, কারণ এটি সমাজের উন্নয়ন এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। সমাজকর্মের পাঠ শুধু তাত্ত্বিক নয়, এটি বাস্তব জীবনে সমাজে পরিবর্তন আনতে সহায়ক। সমাজকর্মের শিক্ষার মাধ্যমে একজন সমাজকর্মী শুধুমাত্র সমাজের সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয় না, বরং মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন, যা একটি শক্তিশালী, ন্যায়সঙ্গত, এবং কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক।